সহস্র স্মৃতি কথার একটি "আজ রাতে নেতারা কেউ বাসায় থাকবেন না-একেএম বেলায়েত হোসেন।
সহস্র স্মৃতি কথার একটি "আজ রাতে নেতারা কেউ বাসায় থাকবেননা- মহিউদ্দিন চৌধুরী
( এ ক )সেদিন ছিল ২৭ অক্টোবর ১৯৮৭ সাল। তখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন চলছে। ঐদিন সন্ধার সময় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের কার্যকরী পরিষদ'র সভা চলছিল দারুল ফজল মার্কেট ভবনস্থ কার্য্যালয়ে। সভাপতি প্রয়াত শ্রদ্ধেয় মান্নান ভাই'র অনুপস্থিতিতে সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন তদানিন্তন সহ-সভাপতি প্রয়াত আবুল কালাম সওদাগর! সভায় আন্দোলনের
কর্মসূচী নিয়ে আলোচনা চলছিল। রাত আটটার কিছু
পর একজন সাধারন লোক অফিসের দরজায় দাঁড়িয়ে ইশারায় মহিউদ্দীন চৌধুরীকে অফিসের করিডোরে ডেকে নিল। আমরা অনুমান করছিলাম, কিছু একটা
নতুন খবর আছে। একমিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে
মহিউদ্দীন চৌধুরী ফিরে এসে নিজ আসনে বসলেন।
এসময় তাঁকে কিছুটা চিন্তত মনে হচ্ছিল।
তদানিন্তন যুগ্ম সাধারন সম্পাদক প্রয়াত সেকান্দর হায়াত খান স্বভাবগতভাবে এ ধরনের বিষয়ে খুব তাড়াতাড়ি জানতে চাইতেন। একজন অত্যন্ত সিন্সিয়ার
নীতিবান দলীয় নেতা ছিলেন সেকান্দর ভাই। তিনি সর্বাগ্রে জিজ্ঞেশ করলেন,"কোন খারব খবর আছে নাকি মহিউদ্দীন ভাই?" তাঁর কথার কোন জবাব না দিয়ে মহিউদ্দীন ভাই বললেন, "সভার কাজ তাড়াতাড়ি
শেষ করেন।" কিছুক্ষনের মধ্যে সভার সমাপ্তি ঘোষনা
করা হলো।
এর পর তিনি বললেন, "আজ রাতে নেতারা কেউ নিজের বাসায় থাকবেননা। বিশেষ করে সেকান্দর
ভাই, লিয়াকত ভাই, বেলায়েত ভাই, বদি ভাই আপনারা
সাবধানে থাকবেন। আজ রাতে নেতাদেরকে গনহারে
গ্রেপ্তার করতে পারে।" জিজ্ঞাশা করলাম, "মহিউদ্দীন
ভাই আপনি কোথায় থাকবেন?" তিনি বললেন, "আমার
জন্য চিন্তা করবেননা।আমি আমার যায়গামত থাকব।আপনার এখনই চলে যান।" সবাই তাৎক্ষনিক অফিস ত্যাগ করলাম।
(২)
সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন, তাড়া হুড়ো করে সবাই চলে গেলেন। আমি অফিস থেকে নীচে নেমে দেখলাম
ছাত্রলীগের নেতা আসলাম হোসন (বর্তমানে একটি ডিগ্রী কলেজের সন্মানিত অধ্যক্ষ) দাঁড়িয়ে আছেন। আসলাম সহ কিছুক্ষণ ঘুরা ফিরা করে সময় কাটাতে লাগলাম। রাত সাড়ে এগারটা নাগাদ আন্দোলনের সময় আমার রাত যাপনের ঠিকানা রিয়াজউদ্দিন বাজারের ভিতরের সেই হোটেলে সংরক্ষিত রুমে গিয়ে উঠলাম। আসলাম আমার সাথে রাত যাপন করছিল।
সকাল দশটার দিকে আওয়ামীলীগ অফিসে গেলাম। যুগ্ম সম্পাদক সেকান্দর ভাই আগেই এসে অফিসে বসেছিলেন। এসময় তখনকার আর এক ছাত্র নেতা আশেক এ রসুল টিপু এসে বলল, "মহিউদ্দীন ভাইকে গত রাত বারটার পর মেট্রোপলিটন পুলিসের ডেপুটি কমিশনার গিয়ে বাসা থেকে নিয়ে এসেছে।" মহিউদ্দী ভাই আমাদেরকে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিলেন। পুলিশ সেরাতে বাসায় বাসায় হানা দিয়ে আমাদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। কিন্তু মহিউদ্দীন ভাই নিজ বাস ভবনে অবস্থান করছিলেন। এই হল আসল জননেতার প্রকৃত স্বরুপ। নিজে ঝুকি গ্রহন করে কর্মীদের মাঝে সাহস সঞ্চার করেন। দেশ ও জনগনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে বৃহত্বর জনগোষ্টির আস্থাভাজন হয়ে থাকেন। সেদিন মহিউদ্দীন চৌধুরীকে বাসায় না পেলে পুলিশ বাধ্য হয়ে অসংখ্য নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করতো। তাতে সৈরাচার বিরোধী আন্দোলনই হয়ত ক্ষতিগ্রস্থ হতো।
মনে হচ্ছিল জাতিরপিতা বঙ্গবন্দ্ধু ৭১ এর ২৬ শে মার্চ তার সহকর্মী-সহচরদের সাথে যে ধরনের আচরন করেছিলেন,আমাদের প্রিয় নেতা জননেতা মহিউদ্দীন চৌধুরী তারই যথার্থ অুকরণ করেছিলেন। আমাদেরকে
নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি নিজে কিন্তু নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন।
সেরাতে আরও যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাদের কয়েকজন হলেন : চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি,সাবেক এমপি প্রয়াত ইসহাক মিয়া, প্রয়াত আবুলকালাম সওদাগর, সন্দ্বীপের সাবেক এমপি প্রয়াত এম ওবায়দুল হক, কমিউনিষ্ট পার্টী নেতা
শাহ আলম প্রমুখ।
( ৩ )
চট্গ্রামের সকল আন্দোলন সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম বিশ্বস্ত-আস্থাভাজন "মহিউদ্দীন ভাই" চট্টলার মাটী ও মানুষের প্রান প্রিয় নেতা আলহাজ এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দ্ধি। এরশাদ শাহী মনে করেছিল
মহিউদ্দীন চৌধুরীকে কারাগারে বন্ধি করে রাখলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে। তাদের সে আশা স্বফল
হয়নি। উপরন্তু মহিউদ্দীন চৌধুরীর মুক্তির দাবী যুক্ত হয়ে সৈরাচার বিরোধী চলমান আন্দোন এক নতুন মাত্রা
লাভ করেছিল।★এসময় দলের অনেক বড় বড় নেতারা আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে 'স্বেচ্ছা নির্বাসনে' চলে গেলেও
মহিউদ্দীন চৌধুরীর সৈন্যরা দৃঢ়ভাবে আন্দোলন এগিয়ে
নেয়। প্রয়াত ত্যাগী নেতা সেকান্দর হায়াত খান তখন ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক। মহিউদ্দীন ভাই এর অবর্তমানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সহিত দায়ীত্ব পালনে সচেষ্ট থাকতেন।
সৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে নব্বুই'র
গন আন্দোলনের বিভিন্ন পর্য্যায়ে প্রকাশ্য রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা/ কারফিউ ইত্যাদি কারণে দলীয় কার্য্যালয়ে বসা বা একত্রিত হওয়া সম্ভব হতোনা। এসব
সংকটকালে সক্রীয় নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার
দায়ীত্ব পালন করতো মহিউদ্দীন চৌধুরীর অত্যন্তআস্থা-
ভাজন সাহসী ছাত্র নেতা হাসান মাহমুদ শমসের। সে সময় পুলিশের দৃষ্টিকে এড়িয়ে যেসব গোপন আস্তানায়
বসে আন্দোলনের গুরুত্তপুর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হতো তার মধ্যে অন্যতম স্থান ছিল জেলখানার বিপরীত পার্শ্বে প্রয়াত ব্যবসায়ী শামসুলআলমের বাড়ী। মহিউদ্দী চৌধুরী জেলখানা থেকেই গুরুত্বপুর্ণ নির্দেশনা দিয়ে পাঠাতেন। আমরা তাঁর পাঠানো নির্দেশনা অনুসারে আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যেতাম।
মহিউদ্দীন চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার ২ মাস ২৭ দিনের
মাথায় ২৪ জানুয়ারি '৮৮ তারিখ জননেত্রী শেখ হাসিনার চট্টগ্রাম সফরের দিন ধার্য্য করা হয়। তখনও
সৈরাচারী এরশাদ প্রকাশ্য মাঠে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ
করে রেখেছিল। জেলখানা থেকে মহিউদ্দীন ভাই এর
পরামর্শ ছিল মুসলিম হলকে সভার স্থান ঘোষনা করা
হোক। মুসলিম হলের মঞ্চ থেকেই সভানেত্রী তাঁর ভাষন দেবেন। সভানেত্রীকে কোন প্রকার ঝুকির মাঝে রাখা যাবেনা। মুসলিম হল থেকে লালদীঘি মাঠ পর্য্যন্ত
মাইকের তার এবং মাইক বাঁধার বাঁশ মাটিতে বিছানো
থাকবে। জনসমাগম বেশি হলে বাঁশে বাঁধা মাইকগুলো
কর্মীরা উপর দিকে তুলে ধরে রাখবে। যৌথ সভায় অতি উৎসাহি নেতারা মহানগর আওয়ামীলীগ এর প্রস্তাবটি গ্রহন করলেননা। সে সভায় লালদীঘির মাঠেই সভা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রয়াত সেকান্দর হায়াত খান অভিমান করে যৌথ সভা ত্যাগ করে চলে আসেন।
২৪ জানুয়ারি সকালের বিমানে জননেত্রী শেখ হাসিনা
চট্টগ্রাম আগমন করেন। ------------
(৪)
২৪ জানুয়ারী ১৯৮৮, পুর্ব ঘোষিত কর্মসুচী অনুসারে
মাননীয় সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সকালের এক
ফ্লাইটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌছেন। সেকান্দর হায়াত
খান সহ আমি আওয়ামীলীগ অফিসের সামনে থেকে হেটে হেটে চৌমুহানি পর্যন্ত গেলাম। রাস্তার উভয় পাশে
লোকে লোকারণ্য। যান চলাচল ছিল বন্ধ। চৌমুহানি থেকে রিক্সা যোগে মোগল টুলি হয়ে কদমতলি মোড়ে
এসে রিক্সা ছেড়ে দিতে হ'ল। ষ্টেশন রোডে যেন মানুষের
ঢল নেমেছিল। আমরা নিউমার্কেটের মোর থেকে সিনেমা প্যালেসের পাশ দিয়ে লালদীঘি মাঠের দিকে যাচ্ছিলাম। আমরা শক্তভাবে একে অপরের হাত ধরে সামনে এগুচ্ছিলাম। চট্টগ্রাম বোর্ডিং এর সীমানা পার হতেই হঠাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ। আমাদের সম্মুখে হকার মার্কেটের গেটে পুলিশ বন্দুক তাক করে পজিশন নিয়ে বসে আছে। আমরা তখনও বুঝতে পারিনাই যে পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বরে বহু লোকের প্রাণ হানি ঘটেছে।পুলিশ আমাদেরকে সামনে যেতে বাধা দিল। সেকান্দর ভাই কোন বাধা মানতে রাজী ছিলেননা। তিনি নিজের দলীয় পরিচয় দিয়ে বললেন 'আমাদেরকে সভাস্থলে যেতে হবে।' তিনি মহানগর আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাক একথা বলার সাথে সাথে পুলিশ সেকান্দর ভাইকে বেধরক পেটাতে শুরু করল। তিনি মাটিতে পরে যান। দুই/তিন জন পুলিশ তাকে টেনে হেছড়ে নিয় গেল। আমাকে কে যেন পেছনদিকে টেনে নিয়ে গেল। পরদিন জাতীয় পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক সহ কয়েকটি পত্রিকায় প্রথম পাতায় আমার পিঠের উপর পুলিশ লাঠি দিয়ে আঘাৎ করার এক পৈশাচিক পুলিশি নির্যাতনের চবি সহ সেদিনের খবর ছাপা হয়েছিল।
পুলিশ সেদিন সেকান্দর ভাইকে ভয়ংকর আহত অবস্থায় শেষ রাতে তাঁর মোহরাস্ত বাড়ীতে পাঠিয়ে
দেয়। একদিন পর আমরা কয়েকজন তাকে তার বাড়ীতে দেখতে গেলাম। সেকান্দর ভাই আমাদের সামনে তার গায়ের কাপড় সরিয়ে নিলে তাঁর সাড়া শরীরে যে আঘাতের চিহৃ দেখেছি তা আজও আমার
কাছে বিভিশিকাময় এক দুঃস্বপ্ন বলেই মনে হয়।
আজ ২৪ জানুয়ারি। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি স্বৈরাচারি এরশাদের পুলিশ সভানেত্রী জননেত্রী শেখ
হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে নেত্রীকে বহনকারী গাড়ী
লক্ষ করে এলোপাথারি গুলি চালায়। নিহত হয় ২৪ জন। নিহতদের রক্তের বিনিময়ে আল্লাহ্ র অসীম রহমতে নেত্রী বেঁচে যান।
********************* চলবে ***********-*********




কোন মন্তব্য নেই
please do not enter any spam link in the comment box.